Wednesday, July 10, 2019

ধর্মে বিচ্ছেদ, মিলনে ক্রিকেট!

পাড়ায় লাগানো হয়েছে জায়ান্ট স্ক্রিন। আজ হতাশায়, টিভি বন্ধ করে দিয়েছিলাম অনেক আগেই। হঠাৎ দেখলাম পাড়ার মাঠ থেকে ঘন ঘন হাততালির আওয়াজ আসছে। গিয়ে দেখি জাদেজা একাই ম্যাচ টেনে নিয়ে যাচ্ছে। গাদাগাদি ভিড়ে প্রায় সকলেই অপরিচিত।
বিদ্যুৎ গতিতে বল ছুটেছে বাউন্ডারির দিকে। পাশে বসে থাকা ছেলেটা নাচতে শুরু করলো। প্রতি ওভারেই প্রায় বাউন্ডারি, আর সেই ছেলের পাগল পারা নাচ। পরনে ছেঁড়া একটা শার্ট আর হাফ প্যান্ট। যাই হোক, একসময় জাদেজাকে ফিরে যেতে হলো প্যাভিলিয়নে। চারিদিকে নীরবতা। পাশে দেখি সেই ছেলে আর নেই। আমারও মন খারাপ হয়ে গেল। মাঠ ছেড়ে বেরোতে যাব, দেখি মাঠের পিছনে হাঁটু গেড়ে বসে আল্লাহর কাছে দোয়া করছে ওই ছেঁড়া জামা পরা ছেলেটাই। মনে হলো একবার ছেলেটার সাথে কথা বলে যায়, তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে গেলাম। স্ক্রিনের দিকে মুখ ঘুরতে দেখি ধোনিও হেঁটে চলেছেন প্যাভেলিয়নের দিকে। সকলের চোখে মুখে হতাশা। ওই ছেলেটির দিকে এগিয়ে গেলাম, ততক্ষণে ওর চোখে জল। কত আর বয়স হবে! বড়জোর চোদ্দ। জিজ্ঞেস করলাম নাম কি তোর? বলল মফিজুল। কথা বলে জানতে পারলাম, অনতিদূরেই একটি চায়ের দোকানে কাজ করে সে। 
সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, পরেরবার নিশ্চয়ই আমরা জিতব।
মুখ ফিরিয়ে হাঁটা দিলাম। কয়েকদিন আগেই আমাদের দেশে নির্বাচন হয়েছে, এই মাঠেও সেই নির্বাচনের ছাপ এখনো লেগে আছে। চোখে পড়লো মোদিজীর বিশাল বড় একটা ছবি।
পরক্ষনেই মনে হল, ইস! খুব ভুল করে ফেললাম যে।  মফিজুলকে সান্ত্বনা দেওয়া আমার ঠিক হয়নি। ওরা তো আমাদের দেশের কেউ নয়! খেলার মাঠে ও কি করছে? ও পাকিস্তানে নেই কেন! কিন্তু কি আশ্চর্য! ভারত হেরে গেলে ওরও কান্না পায়। ঠিক আমাদের মতোই! 

Sunday, June 23, 2019

মিজোরামের কথা

ভারত বর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৭ সালে। তার আগে ব্রিটিশ ভারতে, মিজোরামের নাম ছিল 'লুসাই হিল ডিস্ট্রিক্ট'। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভ করার পরে মিজোরামের মানুষেরা সিদ্ধান্ত নেয় তারা ভারতবর্ষের অখন্ড অংশে যোগদান করবে।

১৯৫৮ সাল। মিজোরামের আকাশে তখন দুর্যোগের মেঘ। 
মিজোরামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক ধরনের বাঁশ গাছ ছিল। সেই বাঁশ গাছের প্রচুর ফুল হয়েছিল সে বছর। যার ফলে মাঠে-ঘাটে ইঁদুরের পরিমাণ প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। ইঁদুর ফসল খেয়ে ফেলায়, দেখা দেয় চরম দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষের ফলে একের পর এক মানুষ মারা যেতে থাকেন। গ্রামের পর গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মিজোরাম ভারতের অখন্ড অংশ হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন ভারত সরকার তাদের কোনরূপ সাহায্য করেনি। ভারত সরকার সাহায্যের হাত না বাড়ানোই, দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করার জন্য স্থানীয় আদিবাসীরা সকলে মিলে গড়ে তোলেন 'Mizo National Famine Front', এই সংগঠনের মূল কাজ ছিল দুর্ভিক্ষ পীড়িত আদিবাসীদের সাহায্য করা। যে কাজ ভারত সরকার করেনি সেই কাজ করে দেখিয়েছিল তৎকালীন এই সংগঠনটি। বছর কয়েক পর আস্তে আস্তে দূর্ভিক্ষ কেটে যায়।

এই সংগঠন পরবর্তীকালে 'মিযো নেশনাল ফ্রন্ট' নাম ধারণ করে আলাদা মিজোরাম দেশ গঠনের দাবি জানাতে থাকে। 

অবশেষে ঘুম মানে ভারত সরকারের। আলাদা দেশ গঠনের দাবি ওঠা মাত্রই গোটা মিজোরাম জুড়ে নামিয়ে দেওয়া হয় কয়েক হাজার ভারতীয় সেনাকে। ভারতীয় সেনার মূল উদ্দেশ্য ছিল মিযো ন্যাশনাল ফন্টের সকল সদস্যকে গ্রেপ্তার করা। পরিস্থিতি আস্তে আস্তে খারাপ হচ্ছিল। ভারতীয় সেনারা ঠিকমতো সামলে উঠতে পারছিলেন না। অবশেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাননীয়া ইন্দিরা গান্ধী নির্দেশ দেন, নির্বিচারে মিজোরামের গ্রামে গ্রামে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপের জন্য। ১৯৬৬ সালের ৫ এবং ৬ ই মার্চ ভারতীয় তুফানি জেট ফাইটার মিজোরামের গ্রামে গ্রামে বোমা নিক্ষেপ শুরু করে। গ্রামের পর গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ মারা যান। পরবর্তীকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বোমা নিক্ষেপের অভিযোগ  সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দেন। 

বোমা নিক্ষেপের পর মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের আন্দোলন আরো জোরদার হয়। প্রায় সব বাড়ির পুরুষেরাই তখন বনে জঙ্গলে বসবাস করে, গরিলা পদ্ধতিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী কে প্রতিহত করতেন। মহিলারা সেই সময় বাড়িতে একা থাকতেন। এরই সুযোগ নেয় তৎকালীন ভারতীয় সেনা অফিসাররা। প্রতি গ্রাম থেকে নিয়ম করে একজন করে মহিলাকে প্রতিরাতে প্রত্যেকটি অফিসারের ঘরে পাঠানো হতো। ওই একই মহিলাকে কয়েকদিন পর আরো অন্য অফিসারকে মনোরঞ্জন করতে হতো। 
এহেন নিষ্ঠুরতার জন্যই, মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের আন্দোলন আরো জোরদার হতে থাকে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। 

অবশেষে ১৯৮৬ সাল, মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং ভারত সরকারের মধ্যে সমঝোতা করেন বর্তমানে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। 

মিজোরামের শান্তি ফিরে আসে। আরেকটা কাশ্মীর হতে হতে রয়ে যায়।